উত্তম সমাজ

প্রবন্ধটি পড়া হলে শেয়ার করতে ভুলবেন না

শুরু করছি মহান আল্লাহর নামে,যিনি পরম করুনাময় অসীম দয়ালু।

লেখকঃড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব

عَنْ أَبِى مُوسَى عَنِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ : إِنَّ الْمُؤْمِنَ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ، يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا. وَشَبَّكَ أَصَابِعَهُ- متفق عليه-

অনুবাদ :হযরত আবু মূসাআশ‘আরী (রাঃ)হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘এক মুমিন আরেক মুমিনেরজন্যএকটি গৃহের ন্যায়। যার একাংশ অপরাংশকে মযবূত করে’। অতঃপর তিনি তাঁরআঙ্গুলগুলি পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে মুষ্টিবদ্ধ করলেন।[1]

হযরত নু‘মান বিনবাশীর (রাঃ) থেকে অন্য বর্ণনায় এসেছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, الْمُسْلِمُونَ كَرَجُلٍ وَاحِدٍ إِنِ اشْتَكَى عَيْنُهُ اشْتَكَى كُلُّهُ وَإِنِ اشْتَكَى رَأْسُهُ اشْتَكَى كُلُّهُ ‘সকলমুমিন একজনব্যক্তির মত। যদি তার চোখে কষ্ট হয়, তাহ’লে সারা দেহে কষ্টবোধ হয়। আর যদি মাথায়ব্যথা হয়, তাহ’লে সারা দেহ ব্যথাতুর হয়’।[2]

একই রাবী থেকেঅন্য বর্ণনায় এসেছে রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেন,

تَرَى الْمُؤْمِنِيْنَ فِى تَرَاحُمِهِمْ وَتَوَادِّهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ كَمَثَلِ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى عُضْوًا تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ جَسَدِهِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى

তুমিঈমানদারগণকে পারস্পরিক সহানুভূতি, বন্ধুত্বও দয়াশীলতার ক্ষেত্রে একটিদেহের মত দেখবে। যখন দেহের কোন অঙ্গ আক্রান্ত হয়, তখনসমস্ত দেহনিদ্রাহীনতা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়’।[3]

উপরোক্তহাদীছগুলিতে উত্তম সমাজের চিত্র অংকিত হয়েছে।এখানে কেবল মুমিনদের কথা বলা হয়েছে।কেননা তারাই আল্লাহর নিকট ‘শ্রেষ্ঠজাতি’ (আলে ইমরান ৩/১১০)। আক্বীদা ওআমলের ক্ষেত্রে একই লক্ষ্যেরঅনুসারী হওয়ায় মুমিন সমাজে এটা সহজেই সম্ভব। তবে কোনসমাজে কেবল মুমিনবাস করে না। বরং কাফির-মুশরিকরাও সেখানে বসবাস করে। সেক্ষেত্রেতাদের সাথেমুমিনদের আচরণ কেমন হবে, সে বিষয়ে ইসলামের সুন্দর নির্দেশনা রয়েছে। যদিতারা মুমিনদের বিরুদ্ধে শত্রুতা না করে, তাহ’লে তাদের প্রতি সর্বোচ্চমানবিক আচরণকরা হবে। কারণ সবাই এক আদমের সন্তান। আদম ছিলেন প্রথম মানুষ ওপ্রথম নবী। কিন্তুকাফের-মুশরিকরা তাদের আদি পিতা-মাতার ধর্ম ত্যাগ করেপথভ্রষ্ট হয়েছে। উত্তম উপদেশও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে তাদেরকে জান্নাতেরপথ দেখানো মুমিনের কর্তব্য। এর জন্য সেনেকী পাবে এবং দুনিয়া ও আখেরাতেসম্মানিত হবে।

মানব সমাজ মূলতঃদু’ভাগে বিভক্ত। একদল আল্লাহকে স্বীকারকরে ও তাঁর বিধান মেনে চলে। আরেক দলনিজেদের সীমিত জ্ঞান তথাপ্রবৃত্তিরূপী শয়তানের পূজা করে ও যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেচলে। উভয় দলপৃথকভাবে বা একত্রিতভাবে সমাজে বসবাস করে। উভয় দলের মধ্যেই রয়েছেকট্টরপন্থী, মধ্যপন্থী ও শৈথিল্যবাদী। সবাইকে নিয়েই সমাজ। আর সমাজ নিয়েইমানুষ।প্রত্যেকে একে অপরের মুখাপেক্ষী। তাই সমাজ গঠনের ও তা পরিচালনারজন্য মানুষকেসর্বদা উচ্চতর জ্ঞানী ও শক্তিমানের অনুসারী হ’তে হয়। আর এটাআল্লাহরই চিরন্তনব্যবস্থাপনা। যখন কোন সমাজ ও সমাজ নেতা আল্লাহর দাসত্বকরে ও তাঁর বিধান মতে চলে, তখন সেই সমাজ হয় উত্তম সমাজ। আর যখন তার বিপরীতহয়, তখন সেটি হয় নিকৃষ্ট ও শয়তানীসমাজ। তবে যেকোন সমাজে যেকোন সময় একইব্যক্তি আল্লাহর দাসত্ব ও শয়তানের দাসত্বদু’টিই করতে পারে। সমাজেরদায়িত্ব হবে তখন শয়তানী তৎপরতাকে রুখে দেওয়া ও মানবতাকেঅক্ষুণ্ণ রাখা।এভাবে ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধের মাধ্যমে উত্তম সমাজ গঠিতহবে। আরউত্তম সমাজ কাঠামোর মধ্যেই উত্তম ব্যক্তি ও পরিবার গড়ে ওঠা সহজ হয়। সমাজেরবৃহত্তম রূপ হ’ল রাষ্ট্র। আর রাষ্ট্র সমূহের ঐক্যবদ্ধ বৃহত্তর রূপ হ’লবিশ্বরাষ্ট্র। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ,  রাষ্ট্র, বিশ্বরাষ্ট্র সবই উত্তমহবে যদি উত্তম নীতিমালা ও উত্তম ব্যক্তিসমষ্টি দ্বারা তা পরিচালিত হয়। আরযদি অনুত্তম নীতিমালা ও অনুত্তম ব্যক্তিসমষ্টিদ্বারা তা পরিচালিত হয়, তবে সেই পরিবার ও সমাজ নষ্ট সমাজে পরিণত হবে। ঐ রাষ্ট্রব্যর্থ রাষ্ট্রেপর্যবসিত হবে। যেমন বর্তমান শতাব্দীতে অধিকাংশ রাষ্ট্র কার্যতঃব্যর্থরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

এখানে সমাজকেগুরুত্ব দিচ্ছি একারণে যে, রাষ্ট্র বলি বাবিশ্বরাষ্ট্র বলি, সমাজই তার ভিত্তি।সমাজ যে আক্বীদা-বিশ্বাস ওরীতি-নীতিতে অভ্যস্ত হবে, রাষ্ট্র সেভাবে পরিচালিত হবে।বাংলাদেশ একটিমুসলিম প্রধান দেশ। কিন্তু এ রাষ্ট্র ইসলামী নীতিতে পরিচালিত হয় না।এরকারণ এখানকার মুসলিম সমাজের অধিকাংশ নেতা ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ। আবার আলেমগণইসলামের আনুষ্ঠানিক ইবাদত সমূহের মাসআলা-মাসায়েল নিয়ে শত দলে বিভক্ত এবংঅনেকে যিদও অহংকারে অন্ধ। সেই সাথে সমাজও বিভক্ত। ইসলামের মূল তাওহীদীরূহ, যা পরস্পরকে দৃঢ়বন্ধনে আবদ্ধ রাখে, তা শিথিল হ’তে হ’তে প্রায় হারিয়েযেতে বসেছে। এখন মুসলমানেরাতাওহীদের উপরে কুফরীকে স্থান দিচ্ছে। ফলে এইসুযোগটা কাজে লাগিয়েছে শয়তান। সে তারযাবতীয় উপায়-উপাদান নিয়ে জান্নাতেররাস্তায় প্রতিরোধ বসিয়েছে আছহাবুল উখদূদেরকাহিনীতে রাস্তা বন্ধকারী বিশালজন্তুটির ন্যায়। শান্তিপ্রিয় অধিকাংশ মানুষ চায়আল্লাহর উপর নিখাদভরসাকারী একদল তরুণ ও তাদের পরিচালনাকারী দৃঢ় ঈমানদার নেতা।আমরা একনিষ্ঠহৃদয়ে চাইলে আল্লাহ অবশ্যই আমাদেরকে তা দিবেন। আমাদের ভবিষ্যৎবংশধরদেরস্বার্থেই আমাদেরকে উত্তম সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। আর তা অবশ্যই হ’তেহবে আল্লাহ প্রেরিত অভ্রান্ত বিধান অনুযায়ী। আমরা সেই আলোকে উত্তম সমাজেররূপরেখানিম্নে তুলে ধরার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

উত্তম সমাজেরভিত্তি :

১. উত্তম সমাজেরভিত্তি হবে নির্ভেজাল তাওহীদ বিশ্বাসের উপরে। কেননা দৃঢ় ও নিখুঁত ভিত্তি ব্যতীত নিখুঁত ওমযবূত ইমারত দাঁড় করানো যায়না। ভিত বাঁকা বা দুর্বল হ’লে ইমারত ভেঙ্গে পড়তেবাধ্য। সেকারণ সর্বাগ্রেএই বিশ্বাস মযবূত করতে হবে যে, আমরা স্বেচ্ছায় দুনিয়াতেআসিনি। আল্লাহআমাদের সৃষ্টি করেছেন নির্দিষ্ট মেয়াদ, কর্ম ও রিযিক দিয়ে। যেমনকারখানায়ঔষধ তৈরী হয় নির্দিষ্ট উপাদান, মেয়াদ ও কার্যকারিতা দিয়ে। নিয়ম মাফিক ঔষধসেবন না করলে ও তার আনুষঙ্গিক বিধান না মানলে যেমন সুস্থ দেহ আশা করা যায়না, তেমনি আল্লাহর বিধান  যথাযথভাবে না মানলেসুস্থ সমাজ আশা করা যায় না।যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ তাই সর্বাগ্রে আক্বীদা সংস্কারকরেছেন এবং শিরকীআক্বীদার স্থলে তাওহীদী আক্বীদার বীজ বপন করেছেন। যাতে মানুষমানুষেরগোলামী ছেড়ে আল্লাহর গোলামীর অধীনে সকলে সমানাধিকার ভোগ করে।

স্বার্থপর সমাজনেতাও তাদের সাথী কায়েমী স্বার্থবাদীরাসকল যুগে সর্বশক্তি নিয়ে নবীদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়েপড়েছে। সেযুগে ছিলসামন্ততন্ত্র, এ যুগে এসেছে গণতন্ত্র। যার চাইতে বড় প্রতারণাএখন আর নেই।অতীত ও বর্তমানের সকল মন্ত্র-তন্ত্রের সারকথা হ’ল সমাজ বারাষ্ট্রনেতাইসার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। সংসদীয় গণতন্ত্রে দলনেতা প্রধানমন্ত্রীরইচ্ছা-অনিচ্ছাই সবকিছু। জনগণের নামে তিনিই স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা ভোগ করেন।সে যুগেগোত্রীয় নেতা ও সামন্ত প্রভুদের স্বেচ্ছাচারিতা তাদের গোত্রের ছোটগন্ডীর মধ্যেসীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন সারা দেশে সরকারী দল ও দলীয়প্রশাসন একচেটিয়া যুলুমচালিয়ে থাকে তথাকথিত ভোটের লাইসেন্স নিয়ে। ইসলামীবিধানে আল্লাহ সার্বভৌম ক্ষমতারঅধিকারী। এখানে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, আইনসভার সদস্য, আদালতের বিচারপতি সবাইআল্লাহর বিধানেরদাসত্ব করতে বাধ্য। আল্লাহ বিরোধী কোন আইন মানতে কোন মানুষ বাধ্যথাকবেনা। ফলে সরকারের যুলুম ও শোষণ থেকে এবং আদালতের অন্যায় বিচারের হাত থেকেমানুষ বেঁচে যাবে।

প্রকৃত অর্থেইসলামী শাসনই হ’ল জনগণের শাসন। এর বিপরীতসবই হ’ল শয়তানী শাসন। যেখানে জনগণের কেবলশোষণ ও বঞ্চনাই লাভ হয়। যেউদ্দেশ্যে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন, তা থেকে তারা চিরবঞ্চিতথাকে। আধুনিকবিশ্বের অভিজ্ঞতাই তার বড় প্রমাণ। অতএব জনগণকে নিজেদের স্বার্থেইইসলামীশাসন নিয়ে আসতে হবে। এজন্য তাদের সামনে মাত্র একটাই পথ খোলা রয়েছে। আর তাহ’ল নিজেদের মধ্যে ইসলামী নেতৃত্ব সৃষ্টি করা ও তাঁর মাধ্যমে সামাজিকঅনুশাসনেঅভ্যস্ত হওয়া। অতঃপর এভাবে সাংগঠনিক ইমারতের মাধ্যমে ক্রমেরাষ্ট্রীয় ইমারত কায়েমকরা। এরূপ ইমারত একাধিক হ’লে সর্বাধিক আল্লাহভীরু ওযোগ্য ব্যক্তিকে ইসলামী বিধিঅনুযায়ী দল ও প্রার্থীবিহীনভাবে সর্বসম্মতনেতা নির্বাচন করতে হবে। যাতে নেতৃত্বনিয়ে ঝগড়ার সুযোগ না ঘটে। অতঃপরআমীর তার মনোনীত আল্লাহভীরু ও যোগ্য ব্যক্তিদেরনিয়ে মজলিসে শূরা গঠনকরবেন। তাদের পরামর্শক্রমে এবং প্রয়োজনে অন্যদের পরামর্শ নিয়েতিনিরাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।

গণতন্ত্রেরধোঁকাবাজি ও স্বৈরাচারী শাসনে অতিষ্ঠ জনগণঅবশ্যই নিজেদের দুনিয়াবী কল্যাণ ওপরকালীন মুক্তির জন্য ইসলামী খেলাফতেরদিকে ফিরে আসবে। যেমন বিগত দিনে সিরিয়ায়খৃষ্টানরা মদীনা থেকে আগত মুসলিমবাহিনীকে স্বাগত জানিয়েছিল এবং স্বধর্মীয় রোমকশাসনকে অগ্রাহ্য করেছিল। এযুগে ইহূদী-খৃষ্টানদের চালান করা তন্ত্র-মন্ত্রকেঅগ্রাহ্য করে মানুষআবারও ইসলামী শাসনকে স্বাগত জানাবে নিজেদের স্বার্থেই। আর তাঅবশ্যই হবেকুরআন ও সুন্নাহর শাসন। ইসলামের নামে নিজেদের রচিত মাযহাবী শাসন নয়।

২. ইসলামী শরীআত :

সমাজ গঠিত ওপরিচালিত হবে ইসলামী শরী‘আতের আলোকে, যারভিত্তি হবে পবিত্র কুরআন ও ছহীহসুন্নাহর উপরে। বিদায় হজ্জের ভাষণেরাসূলুল্লাহ (ছাঃ) উম্মতকে সেই নির্দেশনা দিয়েগেছেন।

তিনি বলেন, ‘তোমরাআমার থেকে হজ্জের নিয়ম-কানূন শিখে নাও। কেননা আগামী বছর আমি তোমাদের সাথে মিলিত হ’তেপারব কি-না জানি না’।[4]আমি তোমাদের মাঝেদু’টি বস্ত্ত ছেড়ে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা উক্ত দু’টিবস্ত্ত অাঁকড়ে থাকবে, ততদিনতোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। আল্লাহর কিতাব ও তাঁরনবীর সুন্নাহ’।[5]

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরাআল্লাহর আনুগত্য কর ও রাসূলেরআনুগত্য কর এবং তোমাদের আমীরের। অতঃপর যদি তোমরাকোন বিষয়ে বিতন্ডা কর, তাহ’লে বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। এটাইউত্তম ও সুন্দরতমসমাধান’ (নিসা ৪/৫৯)। শরী‘আত মুসলিম-অমুসলিম সকলের জন্য প্রযোজ্যএবং তাসকলের জন্য কল্যাণকর। ইসলামী নেতা তার সমাজের অমুসলিম সদস্যেরপ্রতি ইসলামী বিধানঅনুযায়ী আচরণ করবেন। নিঃসন্দেহে তাতে উক্ত ব্যক্তিঅধিকতর উপকৃত হবেন। এরপরেওধর্মীয় বিষয়ে তিনি স্বাধীন থাকবেন।

৩. শরীআতেরব্যাখ্যা হবে ছাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে ছালেহীনের বুঝ অনুযায়ী :

ছাহাবায়ে কেরামছিলেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর শিক্ষাগারেরসরাসরি ছাত্র। কোন অবস্থায় কোনপরিস্থিতিতে তিনি কোন কথা বলেছেন ও কোন কাজকরেছেন, সে ব্যাপারে তাঁরাই বড় সাক্ষী।অতএব কুরআন ও হাদীছের ব্যাখ্যায়তাঁদের ব্যাখ্যাই সর্বাগ্রগণ্য। অতঃপর জ্যেষ্ঠতাবেঈন ও মুহাদ্দেছীনেরব্যাখ্যা অবশ্যই অগ্রাধিকার পাবে। উক্ত মূলনীতি অনুসরণেযেকোন সমস্যারসমাধান করা সম্ভব। সামাজিক ঐক্য ও সংহতি এবং শান্তি ও সমৃদ্ধি এরমাধ্যমেইনিশ্চিত হ’তে পারে। যতদিন মুসলিম উম্মাহ উক্ত নীতি মেনে চলেছে, ততদিনতারাই ছিল পৃথিবীর সেরা জাতি। কিন্তু পরে তারা উক্ত নীতি থেকে বিচ্যুতহওয়ায়অধঃপতিত হয়েছে। সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিশ্ব মানবতা। সমাজেশান্তি ও সমৃদ্ধিফিরিয়ে আনতে গেলে ফেলে আসা নীতিতেই ফিরে যেতে হবে। যুগেযুগে আহলেহাদীছ আন্দোলনমানুষকে উক্ত পথেই আহবান জানিয়েছে। আজও জানিয়েযাচ্ছে।

বৈশিষ্ট্য সমূহ :

১. আল্লাহরসার্বভৌমত্ব :

উত্তম সমাজেরপ্রধান বৈশিষ্ট্য হবে এই সমাজের লোকেরা সকলকাজে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকারকরবে। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারু দাসত্বকরবে না। জীবনের সকল দিক ও বিভাগে কিতাব ওসুন্নাতের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারনিশ্চিত করবে। আর এটাই হ’ল তাওহীদে ইবাদত। মানুষেরনেতৃত্ব ও কর্তৃত্বআল্লাহ প্রেরিত বিধানের অধীনস্ত থাকবে। মানব রচিত আইন কোনঅবস্থায় আল্লাহরআইনকে চ্যালেঞ্জ করবে না। করলে সেটা হবে শিরক। যার পাপ হবে অমার্জনীয়।

২. নেতৃত্বেরপ্রতি আনুগত্য :

উত্তম সমাজেরঅন্যতম বৈশিষ্ট্য হ’ল আনুগত্যশীলতা।আনুগত্যহীন সংগঠন বা অবাধ্য সমাজ কখনোই উত্তমসমাজ হ’তে পারে না।রাসূলুললাহ (ছাঃ) বলেন,

السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ عَلَى الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ، فِيْمَا أَحَبَّ وَكَرِهَ، مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِمَعْصِيَةٍ، فَإِذَا أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلاَ سَمْعَ وَلاَ طَاعَةَ-

‘মুসলিম ব্যক্তিরকর্তব্য হ’ল পসন্দনীয় ও অপসন্দনীয় সকলকর্মে আদেশ শ্রবণ করা ও মান্য করা। যতক্ষণনা কোন পাপকর্মে আদেশ করা হয়।যদি কোন পাপকর্মে আদেশ করা হয়, তাহ’লে কোন আনুগত্যনেই’।[6]

তিনি বলেন, যদিকেউ তার আমীরের কাছ থেকে অপসন্দনীয় কিছুদেখে, তাহ’লে সে যেন তাতে ছবর করে। কেননাযে ব্যক্তি জামা‘আত থেকে এক বিঘতপরিমাণ পৃথক হ’ল, অতঃপর মৃত্যুবরণ করল, সে জাহেলীহালতে মৃত্যুবরণ করল’।[7]

বস্ত্ততঃআনুগত্যহীন সমাজ একটি বিশৃংখল ও জংলী সমাজ।আধুনিক যুগের গণতান্ত্রিক সমাজ যারপ্রকৃষ্ট উদাহরণ। এরই দুর্গন্ধে ইসলামীসংগঠনগুলিও ক্রমে দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়ছে।তাদের মধ্যে এখন আনুগত্যেরবদলে অবাধ্যতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বদলেঅশ্রদ্ধা ওআত্মম্ভরিতার প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। যার ফলে ইসলামী সমাজের মূল রূহ হারিয়েযাচ্ছে। অতএব সংশ্লিষ্টরা সাবধান!

৩. পরামর্শ গ্রহণ :

সমাজ পরিচালনায়যোগ্য ও উত্তম ব্যক্তিদের পরামর্শ গ্রহণঅপরিহার্য। আল্লাহর বিধান অপরিবর্তনীয়।সেখানে কোন পরামর্শ নেই। তবে তাবাস্তবায়নে পরামর্শ প্রয়োজন। যেমন বদর, ওহোদ, খন্দক প্রভৃতি যুদ্ধসমূহছাড়াও দুনিয়াবী প্রায় সকল কাজে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যোগ্যছাহাবীদের নিকটথেকে পরামর্শ নিতেন। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ‘তুমি প্রয়োজনীয় বিষয়ে তাদেরসাথে পরামর্শ কর। অতঃপর যখন তুমি দৃঢ়কল্প হবে, তখন আল্লাহর উপর ভরসা কর।নিশ্চয়ইআল্লাহ তাঁর উপর ভরসাকারীদের ভালবাসেন’ (আলে ইমরান ৩/১৫৯)

পরামর্শ গ্রহণেরবিষয়টি কেবল সংগঠন ও সমাজ পরিচালনায়সীমাবদ্ধ নয়। বরং পরিবার পরিচালনায়ও যরূরী।একক পরিবার হৌক বা যৌথ পরিবারহৌক পরিবার প্রধানকে পরিবারের সদস্য-সদস্যাদের সাথেপরামর্শ করে কোনসিদ্ধান্ত নেওয়া কর্তব্য। তাতে পরিবারের শান্তি ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধিহবে। যদিনেকীর কাজে সিদ্ধান্ত হয়, তবে ঐ পরিবারে আল্লাহর পক্ষ হ’তে বিশেষ রহমত ওবরকত নাযিল হবে। একইভাবে উক্ত সমাজের উপরেও আল্লাহর রহমত নাযিল হবে, যেখানেসর্বদা নেকী ও আল্লাহভীরুতার কাজে পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে এগিয়েযাওয়ারসিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

৪. দায়িত্বশীলতা :

উত্তম সমাজের অন্যতমবৈশিষ্ট্য হ’ল পারস্পরিকদায়িত্বশীলতা। এই সমাজের প্রত্যেক সদস্য পরস্পরের প্রতিদায়িত্বশীল আচরণকরবে। তারা কেউ কাউকে অসম্মান করবে না, যুলুম করবে না, লজ্জিতকরবে না। এইসমাজের প্রত্যেকের জন্য পরস্পরের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান নিষিদ্ধ। এসমাজেকেউ অসুস্থ বা পীড়িত হ’লে অন্যের দায়িত্ব পড়ে যায় তাকে সুস্থ করার ওচিকিৎসাকরার। প্রাথমিক দায়িত্ব নিজ পরিবারের হ’লেও মূলতঃ এ দায়িত্বসমাজের। এমনকি একটাপশু বিপদে পড়লেও এ সমাজের মানুষের কর্তব্য হ’ল তাকেউদ্ধার করা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)বলেন, ‘বিগত যুগে একজন বেশ্যা মহিলা রাস্তাদিয়ে যাবার সময় একটা তৃষ্ণার্ত কুকুরকেদেখতে পায়। তখন সে গভীর কূয়ায়নেমে নিজ চামড়ার মোযায় পানি ভরে এনে তাকে খাওয়ায়।তাতে প্রচন্ড দাবদাহেমৃত্যুর কোলে পৌঁছে যাওয়া কুকুরটি বেঁচে যায়। এতে খুশী হয়েআল্লাহ তাকেক্ষমা করে দেন ও সে জান্নাতবাসী হয়’।[8]এর বিপরীতেআরেকজন মহিলা একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখে না খেতে দিয়ে কষ্ট দিলে সে মারা যায়। এর ফলেঐ মহিলা জাহান্নামী হয়।[9]উত্তম সমাজেপশুর যখন এত সম্মান ও জবাবদিহিতা, সে সমাজে শ্রেষ্ঠতম জীবমানুষের কেমন মর্যাদাহওয়া উচিত, তা অবশ্যই অনুধাবনযোগ্য। আল্লাহ বলেন, ‘আমরা আদম সন্তানকে সম্মানিতকরেছি। তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে চলাচলের বাহনদিয়েছি। তাদেরকে পবিত্র রূযী দানকরেছি এবং আমরা যাদের সৃষ্টি করেছিতাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি’ (ইসরা ১৭/৭০)

বস্ত্ততঃ উপরোক্তদায়িত্বশীলতা থেকেই ইসলামে বিধান দেওয়াহয়েছে মযলূমের প্রতিকারে যালেমের জন্যশাস্তি, ধনীর সম্পদ তারউত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টননীতি, তার সঞ্চিত সম্পদে শতকরাআড়াই টাকাযাকাত ও অন্যান্য নফল ছাদাক্বার বিধান। এতদ্ব্যতীত মানত, কাফফারা, হাদিয়া, আকীকা, কুরবানী ইত্যাদি নানাবিধ দানের ব্যবস্থা।

বলা হয়েছে, ‘যেব্যক্তি বড়দের মর্যাদা বুঝে না ও ছোটদের প্রতি স্নেহ প্রদর্শন করে না, সেমুসলমানের দলভুক্ত নয়’।[10]বলা হয়েছে, ‘তোমরাযমীনবাসীর উপর রহম কর, আসমানবাসী আললাহ তোমাদের উপর রহম করবেন’।[11]বলা হয়েছে, ‘তোমরাপ্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকে স্ব স্ব দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে’।[12]

এভাবে উত্তমসমাজে প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতি দায়িত্বশীলহবে এবং একে অপরের জান-মাল ও ইয্যতরক্ষার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করবে। এরবিনিময় সে আল্লাহর কাছে কামনা করবে। আল্লাহবলেন, ‘তোমরা যা কিছু সৎকর্মঅগ্রিম প্রেরণ করবে, তা তোমরা আল্লাহর নিকট পেয়েযাবে। আর সেটাই হ’ল উত্তমও মহান পুরস্কার’ (মুযযাম্মিল ৭৩/২১)

৫. উত্তম চরিত্র :

উত্তম সমাজেরঅন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হ’ল এ সমাজেরসদস্যরা হবেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী।তাদের কাছে পরস্পরের অধিকারসুরক্ষিত থাকবে। তারা একে অপরের নিকট বিশ্বস্ত হবে।রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)বলেন, ‘কিয়ামতের দিন মুমিনের দাঁড়িপাল্লায় সর্বাধিক ভারী হবেতার উত্তমচরিত্র। আর আল্লাহ ক্রুদ্ধ হন অশ্লীলভাষী ও দুশ্চরিত্র ব্যক্তির প্রতি’।[13]ব্যক্তি জীবনেতারা চরিত্রবান, ধৈর্যশীল, বিনয়ী ও মিষ্টভাষী হবে।পারিবারিক জীবনে সে পিতা-মাতারপ্রতি অনুগত হবে। স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতিসদাচরণ করবে এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথেসদ্ব্যব্যবহার করবে। পুরুষ ও নারীপরস্পরে দৃষ্টি অবনত রাখবে। যথাযথ পর্দা রক্ষাকরে চলবে। মায়ের জাতিকেসর্বোচ্চ সম্মান দিবে। সকল কাজে লজ্জাশীলতা বজায় রাখবে।সামাজিক জীবনে সেপরস্পরকে সালাম করবে, হাসিমুখে কথা বলবে, ওয়াদা ও চুক্তি রক্ষাকরবে।পারস্পরিক লেনদেনে বিশ্বস্ত থাকবে। ঝগড়ার বিষয়ে আপোষকামী থাকবে। হক্কুল্লাহআদায়ের ব্যাপারে সদা যত্নশীল থাকবে। ছালাত, ছিয়াম, যাকাত, ছাদাক্বাহইত্যাদি যথাযথভাবেআদায় করবে। আল্লাহর নে‘মতের শুকরিয়া আদায় করবে। তারপ্রতি সর্বদা ভরসাকারী থাকবেএবং যে কাজ করলে তিনি খুশী হন, সর্বদা সেকাজে অগ্রণী থাকবে। সামাজিক বা রাজনৈতিকদায়িত্ব পেলে সর্বদা অধীনস্তদেরপ্রতি দয়াশীল থাকবে। পরামর্শের মাধ্যমে কাজ করবে।অন্যের জান-মাল ওইয্যতের হেফাযতে যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। চুক্তি রক্ষা করবে এবংজনকল্যাণেনিজেকে উৎসর্গ করবে। সবকিছুর বিনিময় আল্লাহর কাছে চাইবে। ইনশাআল্লাহ এরমাধ্যমে উত্তম সমাজ কায়েম হবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন-আমীন!

[1]. বুখারী হা/৪৮১, মুসলিম হা/২৫৮৫, মিশকাত হা/৪৯৫৫ শিষ্টাচার সমূহঅধ্যায় ১৫ অনুচ্ছেদ

[2]. মুসলিম, মিশকাতহা/৪৯৫৪

[3]. মুত্তাফাক্বআলাইহ, মিশকাত হা/৪৯৫৩

[4]. নাসাঈহা/৩০৬২; ছহীহুল জামেহা/৭৮৮২

[5]. মুওয়াত্ত্বামালেক হা/৩৩৩৮, মিশকাত হা/১৮৬

[6]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৬৪ নেতৃত্ব ওপদমর্যাদাঅধ্যায়

[7]. মুত্তাফাক্বআলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৬৮

[8]. বুখারীহা/৩৩২১, মিশকাত হা/১৯০২

[9]. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৯০২

[10]. আবুদাঊদহা/৪৯৪৩

[11]. আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৪৯৬৯

[12]. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৮৫

[13]. তিরমিযী, মিশকাত হা/৫০৮১ শিষ্টাচারসমূহঅধ্যায়

عَنْ أَبِى مُوسَى عَنِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ : إِنَّ الْمُؤْمِنَ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ، يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا. وَشَبَّكَ أَصَابِعَهُ- متفق عليه-

অনুবাদ : হযরত আবু মূসা আশ‘আরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘এক মুমিন আরেক মুমিনের জন্য একটি গৃহের ন্যায়। যার একাংশ অপরাংশকে মযবূত করে’। অতঃপর তিনি তাঁর আঙ্গুলগুলি পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে মুষ্টিবদ্ধ করলেন।[1]

হযরত নু‘মান বিন বাশীর (রাঃ) থেকে অন্য বর্ণনায় এসেছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, الْمُسْلِمُونَ كَرَجُلٍ وَاحِدٍ إِنِ اشْتَكَى عَيْنُهُ اشْتَكَى كُلُّهُ وَإِنِ اشْتَكَى رَأْسُهُ اشْتَكَى كُلُّهُ‘সকল মুমিন একজন ব্যক্তির মত। যদি তার চোখে কষ্ট হয়, তাহ’লে সারা দেহে কষ্ট বোধ হয়। আর যদি মাথায় ব্যথা হয়, তাহ’লে সারা দেহ ব্যথাতুর হয়’।[2]

একই রাবী থেকে অন্য বর্ণনায় এসেছে রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেন, تَرَى الْمُؤْمِنِيْنَ فِى تَرَاحُمِهِمْ وَتَوَادِّهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ كَمَثَلِ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى عُضْوًا تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ جَسَدِهِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى‘তুমি ঈমানদারগণকে পারস্পরিক সহানুভূতি, বন্ধুত্ব ও দয়াশীলতার ক্ষেত্রে একটি দেহের মত দেখবে। যখন দেহের কোন অঙ্গ আক্রান্ত হয়, তখন সমস্ত দেহ নিদ্রাহীনতা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়’।[3]

উপরোক্ত হাদীছগুলিতে উত্তম সমাজের চিত্র অংকিত হয়েছে। এখানে কেবল মুমিনদের কথা বলা হয়েছে। কেননা তারাই আল্লাহর নিকট ‘শ্রেষ্ঠ জাতি’ (আলে ইমরান ৩/১১০)। আক্বীদা ও আমলের ক্ষেত্রে একই লক্ষ্যের অনুসারী হওয়ায় মুমিন সমাজে এটা সহজেই সম্ভব। তবে কোন সমাজে কেবল মুমিন বাস করে না। বরং কাফির-মুশরিকরাও সেখানে বসবাস করে। সেক্ষেত্রে তাদের সাথে মুমিনদের আচরণ কেমন হবে, সে বিষয়ে ইসলামের সুন্দর নির্দেশনা রয়েছে। যদি তারা মুমিনদের বিরুদ্ধে শত্রুতা না করে, তাহ’লে তাদের প্রতি সর্বোচ্চ মানবিক আচরণ করা হবে। কারণ সবাই এক আদমের সন্তান। আদম ছিলেন প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী। কিন্তু কাফের-মুশরিকরা তাদের আদি পিতা-মাতার ধর্ম ত্যাগ করে পথভ্রষ্ট হয়েছে। উত্তম উপদেশ ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে তাদেরকে জান্নাতের পথ দেখানো মুমিনের কর্তব্য। এর জন্য সে নেকী পাবে এবং দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানিত হবে।

মানব সমাজ মূলতঃ দু’ভাগে বিভক্ত। একদল আল্লাহকে স্বীকার করে ও তাঁর বিধান মেনে চলে। আরেক দল নিজেদের সীমিত জ্ঞান তথা প্রবৃত্তিরূপী শয়তানের পূজা করে ও যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে চলে। উভয় দল পৃথকভাবে বা একত্রিতভাবে সমাজে বসবাস করে। উভয় দলের মধ্যেই রয়েছে কট্টরপন্থী, মধ্যপন্থী ও শৈথিল্যবাদী। সবাইকে নিয়েই সমাজ। আর সমাজ নিয়েই মানুষ। প্রত্যেকে একে অপরের মুখাপেক্ষী। তাই সমাজ গঠনের ও তা পরিচালনার জন্য মানুষকে সর্বদা উচ্চতর জ্ঞানী ও শক্তিমানের অনুসারী হ’তে হয়। আর এটা আল্লাহরই চিরন্তন ব্যবস্থাপনা। যখন কোন সমাজ ও সমাজ নেতা আল্লাহর দাসত্ব করে ও তাঁর বিধান মতে চলে, তখন সেই সমাজ হয় উত্তম সমাজ। আর যখন তার বিপরীত হয়, তখন সেটি হয় নিকৃষ্ট ও শয়তানী সমাজ। তবে যেকোন সমাজে যেকোন সময় একই ব্যক্তি আল্লাহর দাসত্ব ও শয়তানের দাসত্ব দু’টিই করতে পারে। সমাজের দায়িত্ব হবে তখন শয়তানী তৎপরতাকে রুখে দেওয়া ও মানবতাকে অক্ষুণ্ণ রাখা। এভাবে ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধের মাধ্যমে উত্তম সমাজ গঠিত হবে। আর উত্তম সমাজ কাঠামোর মধ্যেই উত্তম ব্যক্তি ও পরিবার গড়ে ওঠা সহজ হয়। সমাজের বৃহত্তম রূপ হ’ল রাষ্ট্র। আর রাষ্ট্র সমূহের ঐক্যবদ্ধ বৃহত্তর রূপ হ’ল বিশ্বরাষ্ট্র। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ,  রাষ্ট্র, বিশ্বরাষ্ট্র সবই উত্তম হবে যদি উত্তম নীতিমালা ও উত্তম ব্যক্তি সমষ্টি দ্বারা তা পরিচালিত হয়। আর যদি অনুত্তম নীতিমালা ও অনুত্তম ব্যক্তিসমষ্টি দ্বারা তা পরিচালিত হয়, তবে সেই পরিবার ও সমাজ নষ্ট সমাজে পরিণত হবে। ঐ রাষ্ট্র ব্যর্থ রাষ্ট্রে পর্যবসিত হবে। যেমন বর্তমান শতাব্দীতে অধিকাংশ রাষ্ট্র কার্যতঃ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

এখানে সমাজকে গুরুত্ব দিচ্ছি একারণে যে, রাষ্ট্র বলি বা বিশ্বরাষ্ট্র বলি, সমাজই তার ভিত্তি। সমাজ যে আক্বীদা-বিশ্বাস ও রীতি-নীতিতে অভ্যস্ত হবে, রাষ্ট্র সেভাবে পরিচালিত হবে। বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ। কিন্তু এ রাষ্ট্র ইসলামী নীতিতে পরিচালিত হয় না। এর কারণ এখানকার মুসলিম সমাজের অধিকাংশ নেতা ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ। আবার আলেমগণ ইসলামের আনুষ্ঠানিক ইবাদত সমূহের মাসআলা-মাসায়েল নিয়ে শত দলে বিভক্ত এবং অনেকে যিদ ও অহংকারে অন্ধ। সেই সাথে সমাজও বিভক্ত। ইসলামের মূল তাওহীদী রূহ, যা পরস্পরকে দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ রাখে, তা শিথিল হ’তে হ’তে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন মুসলমানেরা তাওহীদের উপরে কুফরীকে স্থান দিচ্ছে। ফলে এই সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে শয়তান। সে তার যাবতীয় উপায়-উপাদান নিয়ে জান্নাতের রাস্তায় প্রতিরোধ বসিয়েছে আছহাবুল উখদূদের কাহিনীতে রাস্তা বন্ধকারী বিশাল জন্তুটির ন্যায়। শান্তিপ্রিয় অধিকাংশ মানুষ চায় আল্লাহর উপর নিখাদ ভরসাকারী একদল তরুণ ও তাদের পরিচালনাকারী দৃঢ় ঈমানদার নেতা। আমরা একনিষ্ঠ হৃদয়ে চাইলে আল্লাহ অবশ্যই আমাদেরকে তা দিবেন। আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের স্বার্থেই আমাদেরকে উত্তম সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। আর তা অবশ্যই হ’তে হবে আল্লাহ প্রেরিত অভ্রান্ত বিধান অনুযায়ী। আমরা সেই আলোকে উত্তম সমাজের রূপরেখা নিম্নে তুলে ধরার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

উত্তম সমাজের ভিত্তি :

১. উত্তম সমাজের ভিত্তি হবে নির্ভেজাল তাওহীদ বিশ্বাসের উপরে। কেননা দৃঢ় ও নিখুঁত ভিত্তি ব্যতীত নিখুঁত ও মযবূত ইমারত দাঁড় করানো যায় না। ভিত বাঁকা বা দুর্বল হ’লে ইমারত ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য। সেকারণ সর্বাগ্রে এই বিশ্বাস মযবূত করতে হবে যে, আমরা স্বেচ্ছায় দুনিয়াতে আসিনি। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন নির্দিষ্ট মেয়াদ, কর্ম ও রিযিক দিয়ে। যেমন কারখানায় ঔষধ তৈরী হয় নির্দিষ্ট উপাদান, মেয়াদ ও কার্যকারিতা দিয়ে। নিয়ম মাফিক ঔষধ সেবন না করলে ও তার আনুষঙ্গিক বিধান না মানলে যেমন সুস্থ দেহ আশা করা যায় না, তেমনি আল্লাহর বিধান  যথাযথভাবে না মানলে সুস্থ সমাজ আশা করা যায় না। যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ তাই সর্বাগ্রে আক্বীদা সংস্কার করেছেন এবং শিরকী আক্বীদার স্থলে তাওহীদী আক্বীদার বীজ বপন করেছেন। যাতে মানুষ মানুষের গোলামী ছেড়ে আল্লাহর গোলামীর অধীনে সকলে সমানাধিকার ভোগ করে।

স্বার্থপর সমাজনেতা ও তাদের সাথী কায়েমী স্বার্থবাদীরা সকল যুগে সর্বশক্তি নিয়ে নবীদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সেযুগে ছিল সামন্ততন্ত্র, এ যুগে এসেছে গণতন্ত্র। যার চাইতে বড় প্রতারণা এখন আর নেই। অতীত ও বর্তমানের সকল মন্ত্র-তন্ত্রের সারকথা হ’ল সমাজ বা রাষ্ট্রনেতাই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। সংসদীয় গণতন্ত্রে দলনেতা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছাই সবকিছু। জনগণের নামে তিনিই স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা ভোগ করেন। সে যুগে গোত্রীয় নেতা ও সামন্ত প্রভুদের স্বেচ্ছাচারিতা তাদের গোত্রের ছোট গন্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন সারা দেশে সরকারী দল ও দলীয় প্রশাসন একচেটিয়া যুলুম চালিয়ে থাকে তথাকথিত ভোটের লাইসেন্স নিয়ে। ইসলামী বিধানে আল্লাহ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। এখানে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, আইনসভার সদস্য, আদালতের বিচারপতি সবাই আল্লাহর বিধানের দাসত্ব করতে বাধ্য। আল্লাহ বিরোধী কোন আইন মানতে কোন মানুষ বাধ্য থাকবে না। ফলে সরকারের যুলুম ও শোষণ থেকে এবং আদালতের অন্যায় বিচারের হাত থেকে মানুষ বেঁচে যাবে।

প্রকৃত অর্থে ইসলামী শাসনই হ’ল জনগণের শাসন। এর বিপরীত সবই হ’ল শয়তানী শাসন। যেখানে জনগণের কেবল শোষণ ও বঞ্চনাই লাভ হয়। যে উদ্দেশ্যে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন, তা থেকে তারা চিরবঞ্চিত থাকে। আধুনিক বিশ্বের অভিজ্ঞতাই তার বড় প্রমাণ। অতএব জনগণকে নিজেদের স্বার্থেই ইসলামী শাসন নিয়ে আসতে হবে। এজন্য তাদের সামনে মাত্র একটাই পথ খোলা রয়েছে। আর তা হ’ল নিজেদের মধ্যে ইসলামী নেতৃত্ব সৃষ্টি করা ও তাঁর মাধ্যমে সামাজিক অনুশাসনে অভ্যস্ত হওয়া। অতঃপর এভাবে সাংগঠনিক ইমারতের মাধ্যমে ক্রমে রাষ্ট্রীয় ইমারত কায়েম করা। এরূপ ইমারত একাধিক হ’লে সর্বাধিক আল্লাহভীরু ও যোগ্য ব্যক্তিকে ইসলামী বিধি অনুযায়ী দল ও প্রার্থীবিহীনভাবে সর্বসম্মত নেতা নির্বাচন করতে হবে। যাতে নেতৃত্ব নিয়ে ঝগড়ার সুযোগ না ঘটে। অতঃপর আমীর তার মনোনীত আল্লাহভীরু ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে মজলিসে শূরা গঠন করবেন। তাদের পরামর্শক্রমে এবং প্রয়োজনে অন্যদের পরামর্শ নিয়ে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।

গণতন্ত্রের ধোঁকাবাজি ও স্বৈরাচারী শাসনে অতিষ্ঠ জনগণ অবশ্যই নিজেদের দুনিয়াবী কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির জন্য ইসলামী খেলাফতের দিকে ফিরে আসবে। যেমন বিগত দিনে সিরিয়ায় খৃষ্টানরা মদীনা থেকে আগত মুসলিম বাহিনীকে স্বাগত জানিয়েছিল এবং স্বধর্মীয় রোমক শাসনকে অগ্রাহ্য করেছিল। এ যুগে ইহূদী-খৃষ্টানদের চালান করা তন্ত্র-মন্ত্রকে অগ্রাহ্য করে মানুষ আবারও ইসলামী শাসনকে স্বাগত জানাবে নিজেদের স্বার্থেই। আর তা অবশ্যই হবে কুরআন ও সুন্নাহর শাসন। ইসলামের নামে নিজেদের রচিত মাযহাবী শাসন নয়।

২. ইসলামী শরী‘আত :

সমাজ গঠিত ও পরিচালিত হবে ইসলামী শরী‘আতের আলোকে, যার ভিত্তি হবে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর উপরে। বিদায় হজ্জের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) উম্মতকে সেই নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।

তিনি বলেন, ‘তোমরা আমার থেকে হজ্জের নিয়ম-কানূন শিখে নাও। কেননা আগামী বছর আমি তোমাদের সাথে মিলিত হ’তে পারব কি-না জানি না’।[4] আমি তোমাদের মাঝে দু’টি বস্ত্ত ছেড়ে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা উক্ত দু’টি বস্ত্ত অাঁকড়ে থাকবে, ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাহ’।[5]

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের আমীরের। অতঃপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিতন্ডা কর, তাহ’লে বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। এটাই উত্তম ও সুন্দরতম সমাধান’ (নিসা ৪/৫৯)। শরী‘আত মুসলিম-অমুসলিম সকলের জন্য প্রযোজ্য এবং তা সকলের জন্য কল্যাণকর। ইসলামী নেতা তার সমাজের অমুসলিম সদস্যের প্রতি ইসলামী বিধান অনুযায়ী আচরণ করবেন। নিঃসন্দেহে তাতে উক্ত ব্যক্তি অধিকতর উপকৃত হবেন। এরপরেও ধর্মীয় বিষয়ে তিনি স্বাধীন থাকবেন।

৩. শরী‘আতের ব্যাখ্যা হবে ছাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে ছালেহীনের বুঝ অনুযায়ী :

ছাহাবায়ে কেরাম ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর শিক্ষাগারের সরাসরি ছাত্র। কোন অবস্থায় কোন পরিস্থিতিতে তিনি কোন কথা বলেছেন ও কোন কাজ করেছেন, সে ব্যাপারে তাঁরাই বড় সাক্ষী। অতএব কুরআন ও হাদীছের ব্যাখ্যায় তাঁদের ব্যাখ্যাই সর্বাগ্রগণ্য। অতঃপর জ্যেষ্ঠ তাবেঈন ও মুহাদ্দেছীনের ব্যাখ্যা অবশ্যই অগ্রাধিকার পাবে। উক্ত মূলনীতি অনুসরণে যেকোন সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। সামাজিক ঐক্য ও সংহতি এবং শান্তি ও সমৃদ্ধি এর মাধ্যমেই নিশ্চিত হ’তে পারে। যতদি

Check Also

কারাে ধন্যবাদ পাবার আশা করবেন না

প্রবন্ধটি পড়া হলে শেয়ার করতে ভুলবেন না। শুরু করছি মহান আল্লাহর নামে যানি পরম করুনাময়, …

মন্তব্য করুন

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *